প্রেস সচিব কাফি খানের স্মৃতিচারণ: কেমন ছিলেন রাষ্ট্রপতি জিয়া

· Prothom Alo

৩০ মে বাংলাদেশের সাবেক রাষ্ট্রপতি এবং বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমানের মৃত্যুবার্ষিকী। ১৯৮১ সালের এই দিনে চট্টগ্রাম সার্কিট হাউজে সেনাবাহিনীর কিছু বিপথগামী সদস্যের হাতে তিনি নিহত হন। জিয়াউর রহমানকে নিয়ে তাঁর প্রেস সচিব কাফি খানের স্মৃতিচারণ করা সাক্ষাৎকারমূলক এ লেখাটি লিখেছেন সৈয়দ আবদাল আহমদ

আমার চোখে তিনি একজন গ্রেট স্টেটসম্যান। অসাধারণ এক ব্যক্তিত্ব। সততায় তিনি নজিরবিহীন। মাথার চুল থেকে পায়ের নখ পর্যন্ত সৎ মানুষ। আমার ৮২ বছরের জীবনে এমন সৎ মানুষের সাক্ষাৎ কখনো পাইনি। তাঁকে নির্দ্বিধায় বলব, ওয়ার্কহোলিক বা কাজপাগল একজন মানুষ ছিলেন। বছরের ৩৬৫ দিনই তিনি কাজ করতেন। রাতে চার ঘণ্টার বেশি ঘুমোতেন না। তাঁর অনেক কাজই ছিল অসাধারণ। দেশে বহুদলীয় গণতন্ত্র চালু করা তাঁর একটি অসাধারণ কাজের উদাহরণ।

Visit biznow.biz for more information.

হ্যাঁ, আমি রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের কথা বলছি।

জিয়াউর রহমানের প্রেস সচিব কাফি খান এভাবেই আমার কাছে বর্ণনা করেছিলেন শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানকে। ১৯৭৭ সালের ডিসেম্বর থেকে ১৯৮১ সাল পর্যন্ত রাষ্ট্রপতি জিয়ার প্রেস সচিব ছিলেন তিনি। এই চার বছর তিনি তাঁর সান্নিধ্যে থেকেছেন। তাঁকে দেখেছেন খুব কাছ থেকে। দেখেছেন তাঁর কাজ। বললেন, জিয়াউর রহমান অসাধারণ একজন মানুষ ছিলেন। এমন একজন মানুষ, যাঁর কাছে গেলে মনে হয়, তিনি খুব কাছের মানুষ। আবার এমন ব্যক্তিত্বসম্পন্ন, একেবারে কাছে যেতেও ভয় ভয় হয়। বয়স যতই হোক। ওই সময় তাঁর বয়স আর কতই–বা ছিল—৪১ বছর। তাঁর দিকে উঁচুদৃষ্টিতেই তাকাতে হতো।

আমার কয়েক বছরের অভিজ্ঞতায় বলতে পারি, তাঁর যে গুণাবলি আমি দেখেছি, এককথায় অতুলনীয়! তাঁর কাজগুলো এখনো আমার চোখে ভাসে। প্রকৃতই দেশপ্রেমিক একজন মানুষ ছিলেন তিনি। দেশকে ভালোবাসা, দেশের জন্য কাজ করা, স্বজনপ্রীতিকে প্রশ্রয় না দেওয়া, মানুষকে আপন করে নেওয়া, দিনরাত কাজ করা, সততার সঙ্গে দেশ পরিচালনা করা, বিদেশে বাংলাদেশের ভাবমূর্তিকে উজ্জ্বল করা, দূরদর্শিতা, রাজনৈতিক প্রজ্ঞা—এসব গুণ তখন আমাকে মুগ্ধই করেনি, মনে হয়েছে বাংলাদেশে তাঁর মতো যদি এমন আরও কয়েকজন মানুষ পাওয়া যেত, তাহলে দেশের চেহারাটাই পাল্টে দেওয়া যেত।

জিয়াউর রহমানের প্রেস সচিব কাফি খান

কাফি খান একজন প্রখ্যাত গণমাধ্যম ব্যক্তিত্ব। স্বাধীনতার আগে ও পরে বহু বছর তিনি ভয়েস অব আমেরিকায় (ভিওএ) কাজ করেছেন, খবর পড়েছেন। দেশের রেডিও-টেলিভিশনেও খবর পড়ার ক্ষেত্রে তিনি পরিচিত মুখ ও কণ্ঠ ছিলেন। ‘সূর্যকন্যা’, ‘সীমানা পেরিয়ে’সহ বেশ কয়েকটি চলচ্চিত্রে তিনি অভিনয়ও করেছেন। বহুমুখী প্রতিভার সুদর্শন এই মানুষ লেখালেখির সঙ্গেও জড়িত ছিলেন। নিজের একটি অ্যাডভারটাইজিং ফার্মও গড়ে তুলেছিলেন তিনি। ২০২১ সালে তিনি মারা যান। মৃত্যুর আগপর্যন্ত পরিবার-পরিজন নিয়ে ওয়াশিংটনে থাকতেন।

২০১১ সালের প্রথমার্ধে বাংলাদেশে বেড়াতে এসেছিলেন। খবর পেয়ে তাঁর সঙ্গে সাক্ষাৎ করি। তখন আমার ‘কিংবদন্তির জিয়া’ বইয়ের জন্য একটি সাক্ষাৎকার চাইলে কাফি খান সানন্দে রাজি হন। রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের প্রেস সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালনের অভিজ্ঞতা সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি খুব খুশি হন।

ইরান-ইরাক যুদ্ধে তিনি মধ্যস্থতা করেছেন। তাঁর ওপর দুই দেশের জনগণ এবং সরকারেরই গভীর আস্থা ছিল। যুদ্ধ বন্ধে তিনিও সাধ্যমতো চেষ্টা করেছেন। আমি শুনেছি, তাঁর শাহাদাতের পর ইরাকের লোকজন বলেছেন, আমাদের যুদ্ধটা মনে হয় থেমে যেত, জিয়ার মৃত্যুতে এখন এটা অনিশ্চিত।

তিনি বলেন, আমার জীবনের একটি শ্রেষ্ঠ সময় আমি কাটিয়েছি রাষ্ট্রপতি জিয়ার সঙ্গে। এটাকে একধরনের সৌভাগ্যই বলতে পারেন। সেই দিনগুলোর আনন্দময় স্মৃতিচারণা করলেন তিনি। বললেন, রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের একটি মহৎ গুণ ছিল। তিনি দেশের ভালো ভালো লোককে তাঁর পাশে জড়ো করতে পেরেছিলেন। বিচারপতি আবদুস সাত্তার, পররাষ্ট্রমন্ত্রী অধ্যাপক মুহাম্মদ শামসুল হক, ড. এম এন হুদা, সাইফুর রহমান, ড. ফসিহউদ্দীন মাহতাব—এমন অনেক লোকের সমাগম ঘটেছিল তাঁর সরকারে ও দলে। দূরদর্শী চিন্তাভাবনার লোকের খোঁজ পেলেই তাঁকে তিনি বঙ্গভবনে চায়ের আমন্ত্রণ করেছেন এবং কোনো না কোনোভাবে কাজে লাগিয়েছেন। আমার কথাই ধরুন। হয়তো তিনি রেডিও-টেলিভিশনে খবর পড়া দেখে আমার বিষয়ে চিন্তা করেছেন, ওকে দিয়ে আমার প্রেস সচিবের কাজটা হবে।

স্মৃতিচারণা করে কাফি খান বললেন, রাষ্ট্রপতি জিয়ার সঙ্গে আমার পূর্বপরিচয় ছিল না। স্বাধীনতার আগে ভয়েস অব আমেরিকায় কাজ করতাম। মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে প্রবাসে থেকে আমরাও দেশের পক্ষে কী করা যায় চিন্তা করি। শেখ মুজিবুর রহমানের সঙ্গে হালকা পরিচয় ছিল। সত্তরের নির্বাচনে বিজয়ী হলে তাঁকে অভিনন্দন জানিয়ে চিঠি লিখেছিলাম। তিনি চিঠির উত্তরও পাঠিয়েছিলেন। সেটি এখনো আমার সংরক্ষণে আছে।

মরহুম এনায়েত করিম, এস এ এম এস কিবরিয়া, আবুল মাল আবদুল মুহিত, ড. জিল্লুর রহমান খান, আশরাফউজ্জামান খান, ড. মোহসেন—আমরা মিলে ইস্ট পাকিস্তান লিগ অব আমেরিকা ওয়াশিংটন চ্যাপটার নামে সংগঠন গড়ে তুলি। বাংলাদেশের পক্ষে নানাভাবে জনমত গড়ে তোলার কাজ করি। আমি এ সংগঠনের ট্রেজারার ছিলাম। সাবেক অর্থমন্ত্রী মুহিত সাহেব তখন দূতাবাসে চাকরি করতেন। তাঁর বাসায় একটি বা দুটি মিটিং হওয়ার পর তিনি বললেন, আমার বাসায় আর মিটিং করা যাবে না—অসুবিধা আছে। পরে আমার ছোট বাসাতেই মিটিং হয়। বাংলাদেশের মনোগ্রাম লাগিয়ে আমি ভয়েস অব আমেরিকার অফিসে যেতাম। এ নিয়ে আমাকে অনেক বিড়ম্বনা সইতে হয়েছে। যা–ই হোক, সীমিত পর্যায়ে এভাবেই তখন আমরা আমেরিকায় বাংলাদেশের পক্ষে জনমত গড়ার চেষ্টা করেছি। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর ১৯৭৩ সালে দেশে চলে আসি।

জিয়াউর রহমান

রাষ্ট্রপতির সঙ্গে সাক্ষাৎ

দেশে এসে রেডিও-টেলিভিশনে সংবাদ পাঠ করি। নিজের একটি ছোট্ট ব্যবসা শুরু করি—ইন্টারস্প্যান অ্যাডভারটাইজিং ফার্ম। এভাবে কেটে যায় কয়েকটি বছর। ১৯৭৭ সাল। রাষ্ট্রপতি জিয়া তখন ক্ষমতায়। হঠাৎ একদিন বঙ্গভবন থেকে একটি ফোন পাই। রাষ্ট্রপতির এপিএস ফজলুর রহমান ফোন করে জানান, জিয়াউর রহমান সাহেব আমার সঙ্গে কফি খেতে চান। আমি বললাম, আমার সঙ্গে তো উনার কোনো পরিচয় নেই। ফজলুর রহমান বললেন, আমি তো স্যার কিছু জানি না, আপনি রাষ্ট্রপতির সঙ্গে সাক্ষাৎ করুন, কবে পারবেন। সেটা আমি বললে তো হবে না, রাষ্ট্রপতির শিডিউল অনুযায়ীই হতে হবে।

দুই দিন পর বেলা ১১টায় রাষ্ট্রপতির সঙ্গে আমার সাক্ষাতের সময় নির্ধারিত হলো। আমি বঙ্গভবনে গেলাম। এডিসি আমাকে নিয়ে রাষ্ট্রপতির কামরায় ঢুকতেই জেনারেল জিয়া চেয়ার থেকে উঠে খুব আন্তরিকতার সঙ্গে আমাকে রিসিভ করলেন। পাশের সোফায় নিয়ে গিয়ে বসালেন। বললেন—কী খাবেন, চা না কফি। বললাম, একটি হলেই চলবে। কফি এল। কী জন্য ডেকেছেন কিছুই বললেন না। শুধু কী করছেন, আমেরিকা থেকে কবে এসেছেন, ছেলেমেয়ে ও পারিবারিক অবস্থা এবং ভয়েস অব আমেরিকার চাকরির কথা জানতে চাইলেন।

প্রেসিডেন্ট বললেন, একাত্তরে আপনারা তো আমেরিকায় বাংলাদেশের পক্ষে অনেক কাজ করেছেন? আমি বললাম, সীমিত পর্যায়ে করেছি। আমেরিকান সরকারের চাকরি করতাম। পাকিস্তানের সঙ্গে তখন আমেরিকার সুসম্পর্ক ছিল। তারপরও যতটুকু পেরেছি, আমরা করেছি। জিয়া বললেন, হ্যাঁ, আমি সব শুনেছি। এরপরই বললেন, দেশের জন্য এখন তো আপনাদের মতো লোকদের কিছু করা দরকার। আমি বললাম, আপনারা তো দেশের কাজ করছেনই। তারপরও দেশের প্রয়োজনে যখন যা প্রয়োজন, অবশ্যই করব।

সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের নেওয়া খাল খনন কর্মসূচি।

এভাবেই শেষ হলো সাক্ষাৎ। কেন ডেকেছেন, কিছুই বুঝতে পারলাম না। সালাম দিয়ে বঙ্গভবন ত্যাগ করি। এর প্রায় দুই মাস পর শামসুল হুদা চৌধুরী আমাকে ডাকলেন। গেলাম তাঁর কাছে। ১৯৫১ সাল থেকেই তাঁকে চিনি। তাঁকে হুদা ভাই বলে ডাকতাম। দেখা হতেই হুদা ভাই হেসে হেসে বললেন, রাষ্ট্রপতি সাহেব তোকে তাঁর প্রেস সচিব বানাতে চান। আমি বললাম, প্রেস সচিবের জন্য তো দরখাস্ত করিনি। তিনি বললেন, না, রাষ্ট্রপতি সাহেবের প্রেস সচিব দরকার। যা–ই হোক, দুই দফায় এ নিয়ে আলাপ-আলোচনার পর জয়েন্ট সেক্রেটারি স্ট্যাটাসে ৩ হাজার টাকা বেতনে প্রেস সচিব হতে রাজি হলাম। তখন সচিবদের বেতন ছিল ৩ হাজার টাকা। আমাকে বেতন হিসেবে আড়াই হাজার টাকা এবং অন্যান্য অ্যালাউন্স বাবদ ৫০০ টাকা দেওয়া হলো। আর একটি বাড়ি ও একটি গাড়ির সুবিধা।

সব ঠিক হওয়ার পর ১৯৭৭ সালের ১২ কিংবা ১৩ নভেম্বর হবে, বঙ্গভবনে রাষ্ট্রপতি জিয়ার সঙ্গে দেখা করতে যাই। সালাম দিয়ে দেখা হতেই বুলেটের মতো প্রশ্ন—কবে জয়েন করছেন? স্যার, কবে মানে? তিনি বললেন, না, আমার অত সময় নেই। আমি বললাম, ছোটখাটো একটি ব্যবসা আছে। সেটি গুছিয়ে আসতে কয়েকটা দিন লাগবে। বললেন, না অত সময় নেই। ১ ডিসেম্বর থেকে জয়েন করুন। আমি আজই বলে দিচ্ছি, নোটিফিকেশন হয়ে যাবে। এভাবেই ১৯৭৭ সালের ১ ডিসেম্বর থেকে প্রেস সচিব হিসেবে যোগ দিই। কাছাকাছি গিয়ে ভদ্রলোক মানুষটাকে দেখলাম—একজন অমায়িক মানুষ। তাঁর ব্যবহার, তাঁর কাজ কোনো—কিছুরই তুলনা হয় না।

আমি প্রেস সচিবের চাকরিতে যোগ দেওয়ার পরপরই একটি বিদেশ সফর এল। ঢাকা-কাঠমান্ডু, কাঠমান্ডু-দিল্লি, তারপর ঢাকায় এসে আবার পাকিস্তান। সফরে গিয়ে প্রচণ্ড জ্বরে পড়ে গেলাম। রাষ্ট্রপতির ব্যক্তিগত চিকিৎসক ডা. নওয়াব আলী জ্বর কমার ট্যাবলেট দিলেন। কাঠমান্ডুতে কোনোভাবে কাটিয়ে দিল্লি গেলাম। জ্বর আরও বেড়ে গেল। ফলে আজমির শরিফে যেতে পারলাম না, অশোকা হোটেলেই রয়ে গেলাম।

দিল্লি সফর শেষ করে ঢাকায় ফিরছি এফ-২৭ ফকার বিমানে করে। রাষ্ট্রপতি যে আসনে বসেছেন, তার থেকে কয়েকটি আসন পরেই আমি বসেছি। কোনাকুনিভাবে রাষ্ট্রপতি আমাকে দেখতে পান। আমার সিটের পাশে একটি সিট খালি। আমি আড়ষ্ট হয়ে বসে আছি। বিমানের পার্সার এসে জুস খেতে দিলেন। আমি জুস খাচ্ছি। এ সময় রাষ্ট্রপতি জিয়া আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘কী প্রেস সেক্রেটারি সাহেব, আরও স্ট্রং কিছু খান।’ এভাবে তিনি হিউমারও করতেন।

তিনি ছিলেন প্রচণ্ড রকমের কাজপাগল মানুষ।

দেশের প্রতি ছিল অকৃত্রিম ভালোবাসা

বাংলাদেশের প্রতি রাষ্ট্রপতি জিয়ার ছিল অকৃত্রিম ভালোবাসা। এই দেশকে কীভাবে স্বনির্ভর করবেন, এটা ছিল তাঁর সব সময়ের স্বপ্ন। জিয়া সব সময় বাংলাদেশের বিপুল প্রাকৃতিক সম্পদ অনুসন্ধান, আহরণ এবং তা দিয়ে দেশের চাহিদা পূরণের ওপর জোর দিতেন। তিনি বিশ্বাস করতেন, আমাদের গ্যাস যখন আছে, তখন তেলও পাওয়া যাবে অবশ্যই—শুধু খুঁজে বের করার অপেক্ষা। বড়পুকুরিয়ার কয়লা ও মধ্যপাড়ার কঠিন শিলা তাঁর সময়েই আবিষ্কৃত হয়।

তিনি বলতেন, আমাদের বাংলাদেশের অনেক সমস্যা আছে। একে স্বনির্ভর করতে হবে। স্বনির্ভর হতে হলে খাদ্যে স্বনির্ভরতা অর্জন করতে হবে। ফসল ফলাতে হবে। কৃষকদের সেচের ব্যবস্থা করে দিতে হবে। সেচের জন্য খাল খনন করতে হবে।

দেশজুড়ে তাঁর খাল খনন কর্মসূচি বাংলাদেশকে স্বনির্ভর করার জন্যই তিনি নিয়েছিলেন। তাঁর নেওয়া কর্মসূচির হাজামজা নদী, খাল ও জলাশয়গুলোর সংস্কারের কাজে স্বেচ্ছাসেবক তরুণ সমাজ সোৎসাহে এগিয়ে এসেছিল। আরও বহু লোক এসেছিল জিয়াউর রহমানের নেওয়া ‘খাদ্যের বিনিময়ে কাজ’ কর্মসূচি অনুযায়ী। খরার সময় সেচের জন্য যথেষ্ট পানি ধরে রাখা আর বর্ষায় বন্যার পানি দ্রুত নেমে যাওয়ার পথ করে দেওয়া ছিল খাল খনন কর্মসূচির উদ্দেশ্য। এ কর্মসূচিতে দেশজুড়ে অভূতপূর্ব উৎসাহ দেখা দিয়েছিল। জেলায় জেলায় প্রকল্প তৈরি করে ওই প্রকল্প জিয়া নিজে উদ্বোধন করতেন।

কোদাল হাতে মাটি কাটতেন জিয়া নিজেই। এভাবেই তিনি মানুষকে উদ্বুদ্ধ করতেন। তিনি সারা দেশ চষে বেড়িয়েছেন। আজ চট্টগ্রাম, তো কাল সিলেট। দুর্গম এলাকাগুলোয় হেলিকপ্টারে করে গেছেন। ঢাকার বাইরে প্রতি মাসে ৮ থেকে ১০ দিন আমাদের কাটাতে হতো। বিভিন্ন জায়গায় মাইলের পর মাইল হাঁটতে হতো। এমনকি একটানা চার থেকে পাঁচ মাইল পর্যন্ত হাঁটতে হতো। রোজার দিনেও হেঁটে বিভিন্ন এলাকায় যেতে হয়েছে। হাঁটতে হাঁটতে আমাদের জিব বেরিয়ে গেছে। কিন্তু ওই লোকটার কোনো ক্লান্তি নেই।

রাষ্ট্রপতি বিদেশে গেলে কর্নেল আনিস বিদেশ থেকে ইলেকট্রনিক পণ্য নিয়ে আসতেন। রাষ্ট্রপতির টিমে থাকার কারণে এগুলো বিমানবন্দরে চেকিং হতো না। ফলে ডিউটিও দিতে হতো না। কর্নেল আনিস এগুলো বাইরে বিক্রি করতেন। এই অভিযোগ রাষ্ট্রপতি জিয়ার কানে গেলে তিনি বিদেশ থেকে আসার সময় তাঁর টিমের সব সদস্যের লাগেজ চেকিং করার নির্দেশ দিলেন। চেকিংয়ের পর কর্নেল আনিসের লাগেজে চোরাই ইলেকট্রনিক পণ্য পাওয়া গেল। সঙ্গে সঙ্গে তাঁকে চাকরি থেকে বরখাস্ত করা হলো।

জিয়ার ব্যক্তিগত চিকিৎসক ছিলেন ডা. মাহতাবউদ্দিন ইসলাম। তিনি ডিহাইড্রেশন থেকে বাঁচাতে আমাদের লেবু দিয়ে লবণপানি খাইয়েছেন। কিন্তু জিয়াউর রহমানের ডিহাইড্রেশনের বালাই নেই। তাঁকেও ডা. মাহতাবউদ্দিন ওই শরবত খেতে পরামর্শ দিতেন। কিন্তু তিনি বলতেন, ওই সব আমার লাগবে না। তাঁর সঙ্গে হাঁটতে গিয়ে আমরা ঘামতে ঘামতে হয়রান হয়ে গেছি। সমানতালে হাঁটতে না পেরে অনেক পেছনে পড়ে যেতাম। দেখা গেছে, অনুষ্ঠান শুরু হয়ে যাওয়ার পর আমরা সেখানে পৌঁছেছি।

তিনি বলতেন, কী ব্যাপার, আপনাদের আসতে এত দেরি কেন? আমি বলতাম, স্যার, আপনার তো লেফট-রাইট করার অভ্যাস। আমাদের তো একটু দেরি হবেই। তিনি মুচকি হাসতেন। বিরামহীন গণসংযোগে তিনি মানুষের একেবারে কাছাকাছি চলে গিয়েছিলেন। সাধারণ মানুষের কাছে তাঁর ছিল ‘রাজার’ আসন। সাধারণ মানুষ তাঁকে ‘রাজাই’ বলত। তবে সেই ‘রাজা’ ছিল অতি সাধারণ। দেশের সাধারণ মানুষের কল্যাণ নিয়েই ছিল তাঁর কাজকর্ম।

একটা ঘটনা শুনুন। ১৯৭৮ সালে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের সময় খুলনা থেকে জগন্নাথগঞ্জঘাট এলাকায় আমরা ট্রেনে গণসংযোগে বেরিয়েছি। মাঝেমধ্যে পথসভা-জনসভা হচ্ছে। অমনি একদিন বিকেলে একটি স্টেশনের কাছে জনসভা শেষ করে ট্রেনে উঠছি। এ সময় গায়ে ফতুয়া ও লুঙ্গি পরা এক বৃদ্ধ এসে বললেন, মিটিং তো শেষ—‘রাজারে’ দেখবার পায়াম না—অর্থাৎ তাঁরা তাঁকে রাজাই মনে করতেন; যদিও জিয়াউর রহমান এ শব্দগুলো পছন্দ করতেন না।

কাফি খান বললেন, স্বজনপ্রীতি শব্দটা রাষ্ট্রপতি জিয়ার অভিধানে ছিল না। দুর্নীতিসংক্রান্ত কোনো কাজকে তিনি কখনো প্রশ্রয় দেননি। রাষ্ট্রপতির মতো এত বড় একটি পদে থেকেও তিনি অতি সাধারণ জীবন যাপন করতেন। নিজের পরিবারের জন্য তিনি কিছুই করেননি; নিজের জন্য তো করেনইনি। আত্মীয়স্বজনের কেউ কোনো তদবিরের জন্য বঙ্গভবনে বা বাসভবনে সাক্ষাৎ করতে আসবেন, সেটা ছিল অকল্পনীয় ব্যাপার। তেমন সাহস কারও ছিল না। অসৎ কাউকে তিনি তাঁর কাছে ঘেঁষতে দিতেন না।

প্রেস সচিব হিসেবে বঙ্গভবনে আমার অফিস থাকলেও মাঝেমধ্যে আমাকে কাজের স্বার্থে রাষ্ট্রপতির বাসভবনেও অফিস করতে হতো। সেখানে তাঁর স্ত্রী বেগম খালেদা জিয়াকে এক দিনের জন্যও আমি দেখিনি। তিনি ছিলেন একেবারেই অন্তঃপুরবাসিনী। অফিসের ধারেকাছেও আসতে পারতেন না। তিনিও আসতেন না।

খালেদা জিয়াকে একমাত্র দেখা যেত রাষ্ট্রপতি জিয়া কোনো রাষ্ট্রীয় সফরে বিদেশে গেলে সেখানে তাঁর সফরসঙ্গী হিসেবে। তা–ও সব সফরে নয়; যেসব রাষ্ট্রীয় সফরে প্রোটোকলের প্রয়োজনে যেতে হতো, সেগুলোয়। এ ছাড়া কোনো রাষ্ট্র বা সরকারপ্রধান বাংলাদেশে সফরে এলে রাষ্ট্রীয় ভোজে খালেদা জিয়া অংশ নিতেন। সেটাও প্রোটোকলের স্বার্থে। আর দুই ঈদের নামাজ পড়ার পর বঙ্গভবনের রেওয়াজ অনুযায়ী অতিথিদের সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময়ের জন্য তাঁকে আসতে হতো।

কূটনীতিতে জিয়াউর রহমান অসাধারণ সাফল্য রেখেছিলেন। বিদেশে তিনি বাংলাদেশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করেন।

খুব পরিমিত খাবার খেতেন

জিয়ার সততার তো তুলনাই হয় না। তিনি যে বেতন পেতেন, তা আর কত? তিন থেকে চার হাজার টাকার মতো। আমি নিজে তাঁর বেতনের কাগজ দেখেছি। সেখান থেকে তিনি ১৫০ টাকা রাষ্ট্রপতির রিলিফ ফান্ডে জমা দিতেন। বাকি টাকা দিয়ে সংসার চালাতেন। জিয়া খুব পরিমিত খাবার খেতেন। তাঁর বাড়ির হাঁড়িতে অতি সাধারণ খাবার হতো। একটা মাছ বা মাংসের তরকারি, একটা ডাল, একটা সবজি। মন্ত্রীদের দেখেছি, তাঁর বাসায় খেতে বললে রাজি হতেন না। কারণ, এতটুকু খেয়ে তো তাঁদের পোষাবে না। রাষ্ট্রপতি জিয়া বলতেন, এর বেশি তো অ্যাফোর্ড করতে পারি না। ঢাকার বাইরে গেলে ডিসিরা খাবারের আয়োজন করতেন। সেখানেও কড়া নির্দেশ ছিল—একটা ভাজি, একটা ডাল, একটা মাছ বা মাংস। এর বেশি খাবার করা যাবে না।

জিয়া মিষ্টি খুব পছন্দ করতেন। খাবারে মিষ্টি থাকলে খুশি হতেন। না থাকলে আপত্তি করতেন না। তাঁর সততার আরেকটি দৃষ্টান্ত শুনুন। তাঁর ছেলে আরাফাত রহমান কোকো ঢাকা রেসিডেন্সিয়াল মডেল স্কুলে পড়ত। এই স্কুলের প্রিন্সিপাল আমার পরিচিত। তাঁর কাছে শুনেছি, কোকো তাঁর কাছে পড়তে আসত। তার পায়ে ছিল ছেঁড়া জুতা। একদিন প্রিন্সিপাল কোকোকে বললেন, ছেঁড়া জুতা বদলাচ্ছ না কেন? কোকোর উত্তর—বাবাকে বলেছিলাম, তিনি বলেছেন কয়েক দিন পরে কিনে দেবেন। একজন রাষ্ট্রপতি তাঁর ছেলের এক জোড়া জুতা কিনতেও হিমশিম খাচ্ছেন।

একটা পুরোনো হাতঘড়ি ছিল তাঁর। ঘড়িটি খুব দামিও ছিল না। অনেকে বলত, স্যার, ওটা অনেক পুরোনো হয়ে গেছে। এটা বাদ দিয়ে একটা ভালো ঘড়ি কিনুন। ওটা আর আপনার হাতে মানায় না। জিয়া শুনে শুধু মুচকি হাসতেন। একবার এক জনসভায় ভাষণ দিতে যাওয়ার পথে দর্শকদের ভিড় ঠেলে তাঁদের সঙ্গে হাত মেলাতে মেলাতে এগোনোর সময় অথবা জনসভায় ভাষণ দিয়ে ফেরার পথেও হতে পারে—ঠিক মনে নেই আমার, ঘড়িটা জিয়ার হাত থেকে খুলে পড়ে যায় অথবা খোয়া যায়। সে জন্য তাঁর যে কী আফসোস! ঘড়িটার শোক তিনি অনেক দিন ভুলতে পারেননি।

দুর্নীতিকে প্রশ্রয় না দেওয়ার উদাহরণ

বিভিন্ন রাষ্ট্রীয় সফরকালে প্রাপ্ত সব উপঢৌকন বা উপহারসামগ্রী রাষ্ট্রীয় সম্পত্তি বলে গণ্য করতেন জিয়াউর রহমান। সেসব তিনি বঙ্গভবনে তোশাখানায় পাঠিয়ে দিতেন। এমনকি তাঁর সহধর্মিণী বেগম খালেদা জিয়া যে অল্প কয়েকবার তাঁর সফরসঙ্গী হন, তিনিও যেসব উপহারসামগ্রী পেয়েছেন, তা ব্যবহার করতে পারেননি। তোশাখানায় জমা দিতে হয়েছে। এই লোকটাকে সৎ বলব না তো কাকে বলব?

দুর্নীতিকে প্রশ্রয় না দেওয়ার আরেকটি উদাহরণ আপনাকে দিই। রাষ্ট্রপতির নিরাপত্তা টিমে ছিলেন কর্নেল আনিস নামের একজন কর্মকর্তা। রাষ্ট্রপতি বিদেশে গেলে কর্নেল আনিস বিদেশ থেকে ইলেকট্রনিক পণ্য নিয়ে আসতেন। রাষ্ট্রপতির টিমে থাকার কারণে এগুলো বিমানবন্দরে চেকিং হতো না। ফলে ডিউটিও দিতে হতো না। কর্নেল আনিস এগুলো বাইরে বিক্রি করতেন। এই অভিযোগ রাষ্ট্রপতি জিয়ার কানে গেলে তিনি বিদেশ থেকে আসার সময় তাঁর টিমের সব সদস্যের লাগেজ চেকিং করার নির্দেশ দিলেন। চেকিংয়ের পর কর্নেল আনিসের লাগেজে চোরাই ইলেকট্রনিক পণ্য পাওয়া গেল। সঙ্গে সঙ্গে তাঁকে চাকরি থেকে বরখাস্ত করা হলো।

জিয়ার ছিল আলাদা একটা ক্যারিশমা

জিয়াউর রহমান সত্যিই একজন গ্রেট স্টেটসম্যান। বিদেশে তিনি বাংলাদেশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করেছেন। বিদেশে বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রনায়কদের সঙ্গে তিনি ইকুয়াল লেভেলে কথা বলতে পারতেন। আমি দেখেছি।

যুগোস্লাভিয়া তখন ভাগ হয়নি। যুগোস্লাভিয়ার প্রেসিডেন্ট মার্শাল টিটোর তখন দুর্দান্ত প্রতাপ। টিটোর সঙ্গে জিয়া এমনভাবে কথা বলছেন, মনেই হয়নি তৃতীয় বিশ্বের একজন নেতা মার্শাল টিটোর মতো একজন স্টেটসম্যানের সঙ্গে সমানতালে বৈঠক করছেন। জিয়া ধূমপান করতেন না। মার্শাল টিটো ঘন ঘন ধূমপান করতেন। টিটো জিয়াকে সিগারেট এগিয়ে দিলে তিনি তা নিয়েছেন এবং দুটান দিয়েছেন।

কিউবার প্রেসিডেন্ট ফিদেল কাস্ত্রোর সঙ্গেও তাঁকে এভাবে ইকুয়াল লেভেলে বৈঠক করতে দেখেছি। নর্থ কোরিয়ার ৩০তম স্বাধীনতাবার্ষিকীতে জিয়াকে প্রধান অতিথি হিসেবে দাওয়াত করা হয়েছে। ওই অনুষ্ঠানে অনেক দেশের রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধান উপস্থিত ছিলেন।

ইরান-ইরাক যুদ্ধে তিনি মধ্যস্থতা করেছেন। তাঁর ওপর দুই দেশের জনগণ এবং সরকারেরই গভীর আস্থা ছিল। যুদ্ধ বন্ধে তিনিও সাধ্যমতো চেষ্টা করেছেন। আমি শুনেছি, তাঁর শাহাদাতের পর ইরাকের লোকজন বলেছেন, আমাদের যুদ্ধটা মনে হয় থেমে যেত, জিয়ার মৃত্যুতে এখন এটা অনিশ্চিত।

রাষ্ট্রপতি জিয়াকে একজন ভিশনারি রাষ্ট্রনায়ক হিসেবে উল্লেখ করে কাফি খান বলেন, আমি কাছ থেকে তাঁর এই দূরদর্শিতা লক্ষ করেছি। দক্ষিণ এশীয় আঞ্চলিক সহযোগিতা ফোরাম—সার্ক, তাঁরই ভিশন। যদিও এই সার্কের জন্মটা তিনি দেখে যেতে পারেননি। তিনি বেঁচে থাকলে সার্ক আরও শক্তিশালী ফোরাম হিসেবে গড়ে উঠত। বাংলাদেশের ইমেজ সারা বিশ্বে ছড়িয়ে দেওয়া জিয়ার আরেক ভিশন। তলাবিহীন ঝুড়ির অপবাদ তিনি ঘুচিয়ে দিয়ে গেছেন। তাঁকে বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রপ্রধানেরা সমীহ করতেন।

জিয়ার ছিল আলাদা একটা ক্যারিশমা। মরহুম শেখ মুজিবেরও ক্যারিশমা ছিল। মজার কথা হলো, শেখ সাহেব সম্পর্কে কোনো দিন কোনো নেতিবাচক মন্তব্য বা তাচ্ছিল্য প্রদর্শন করার মতো কোনো উক্তি জিয়ার মুখ থেকে আমি শুনিনি। আজকাল যদিও উল্টোটা দেখি; জিয়াউর রহমানের নামটা মুছে দিলেই যেন তাঁকে ইতিহাস থেকে মুছে দেওয়া যাবে। কিন্তু তাঁর আসন তো মানুষের হৃদয়ে।

২টায় বাসায় ফিরলেও খুব ভোরেই তিনি ঘুম থেকে উঠে যেতেন। ফজরের নামাজ পড়ে নাশতা সেরে অফিসের জন্য তৈরি হতেন। চার ঘণ্টার বেশি ঘুমোতেন না। বঙ্গভবনে ব্যক্তিগত স্টাফ কিংবা কর্মকর্তাদের সঙ্গে তাঁকে কখনো কোনো খারাপ ব্যবহার করতে দেখিনি। গাফিলতি দেখলে কিছুটা উত্তেজিত হতেন। কাজে অবহেলার জন্য কেন এটা হয়নি, করেননি কেন—এতটুকুই বলতেন।

জিয়াউর রহমানের একটি অসাধারণ কাজ হলো দেশে বহুদলীয় গণতন্ত্র চালু করা। দেশে বাকশাল প্রতিষ্ঠার পর একদলীয় শাসন চলছিল। ওই মিলিটারি লোকটাই তো গণতন্ত্র ফিরিয়ে আনলেন। জিয়াকে বলা হয় তিনি নাকি ষড়যন্ত্র করেছেন। তিনি কখন ষড়যন্ত্র করবেন? ষড়যন্ত্র তো করেছেন ব্রিগেডিয়ার খালেদ মোশাররফ। তিনি তো অন্তরিন ছিলেন। অন্তরিন অবস্থা থেকে তাঁকে বের করে এনে ক্ষমতায় বসানো হয়। তাঁর বড় অ্যাচিভমেন্ট তিনি দেশকে গণতন্ত্রের পথে নিয়ে গেছেন, সঠিক রাস্তায় নিয়ে গেছেন। লাইনচ্যুত গাড়িটাকে লাইনে তুলেছেন। মিলিটারি লোক হলেও তাঁর মুখেই আমরা শুনেছি। তিনি বলেছেন, ‘সামরিক শাসন কোনো স্থায়ী ব্যবস্থা হতে পারে না।’

এত সব পুরস্কার তাঁর প্রচলন করা

বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ জিয়াউর রহমানের আরেকটি ভিশন। অনেক বুদ্ধিজীবী বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদের কথা শুনলে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করেন। জিয়া বলতেন, আমরা বাঙালি তো বটেই, যেহেতু বাংলাদেশ হয়ে গেছে, সেখানে তো আমাকে দেশের পরিচয় দিতে হবে। সেটাই তো বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ। আমরা বাংলাদেশ করেছি, বাংলাদেশি পরিচয় দিতে অসুবিধা কোথায়? ওই বুদ্ধিজীবীদের কথা অনুযায়ী বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ বা বাংলাদেশি পরিচয় দিলে যেন বাঙালিত্ব খারিজ হয়ে যায়। আসলে বেশি বাঙালি হতে গিয়ে বাংলাদেশি পরিচয়কে আমরা গৌণ করে ফেলছি।

জিয়া ছিলেন বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদের চেতনায় বিশ্বাসী একজন খাঁটি নির্ভেজাল দেশপ্রেমিক। তাঁর প্রিয় একটা গান ছিল—‘প্রথম বাংলাদেশ আমার শেষ বাংলাদেশ’, যেটা পরবর্তীকালে তাঁর প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক দল বিএনপি দলীয় সংগীত হিসেবে গ্রহণ করে।

কদিন আগে দেখলাম, প্রধানমন্ত্রী (তৎকালীন) শেখ হাসিনা এক সমাবেশে এ দেশের সংস্কৃতির বিকাশে অবদান রাখার ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন। তিন দশকের বেশিকাল আগে রাষ্ট্রপতি জিয়া শুধু যে সেটা ভেবেছিলেন, তা–ই নয়, এর বাস্তব রূপও দিয়েছিলেন। এসবেরই নিদর্শন শিশুদের প্রতিভা বিকাশের জন্য টেলিভিশনে ‘নতুন কুঁড়ি’ অনুষ্ঠানের আয়োজন, বাংলাদেশ শিশু একাডেমি প্রতিষ্ঠা, জাতীয় শিশু পুরস্কার প্রবর্তন, জাতীয় টেলিভিশন পুরস্কার প্রবর্তন, স্বাধীনতা ও একুশে পদক প্রবর্তন এবং জিয়ার নির্দেশনা ও পৃষ্ঠপোষকতায় চালু হয় জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার এবং সুস্থ ধারার ছবি নির্মাণ। উৎসাহিত করার জন্য চালু হয় অনুদানের প্রথা।

আওয়ামী লীগের বিকল্প হিসেবে তিনি বিএনপি প্রতিষ্ঠা করেন। তিনি মনে করতেন, বিকল্প দল না হলে গণতন্ত্র স্থায়ী হবে না। বিএনপিকে ক্যান্টনমেন্টের দল বলা হয়। ক্যান্টনমেন্টেই বলেন আর যা–ই বলেন, বিএনপি একটা বিশাল রাজনৈতিক দলে পরিণত হয়েছে, এটা তো অস্বীকার করার উপায় নেই। এরশাদ তো ৯ বছর ক্ষমতায় ছিলেন। তিনিও তো দল করেছেন। তাঁর দল তো এত বিশাল হতে পারেনি। আজ এ কথা বলতে দ্বিধা নেই, জিয়ার সাড়ে তিন বছরের রাজনীতিই আওয়ামী লীগের অর্ধশতাব্দীর বেশি সময়ের রাজনীতিকে মোকাবিলা করছে।

কাজপাগল মানুষ

রাষ্ট্রপতি জিয়ার দৈনন্দিন কর্মসূচি কেমন ছিল—জানতে চেয়েছিলাম। কাফি খান বলেন, রাষ্ট্রপতির দিনের কাজ শুরু হতো সকাল ৭টায়। বাসায় ফিরতে ফিরতে রাত ২টা হয়ে যেত। কিন্তু ভোরে উঠে নামাজ পড়েই অফিসের জন্য তৈরি হতেন। তাঁর দৈনন্দিন কর্মসূচি বা নির্ঘণ্ট তৈরি করতেন মিলিটারি সেক্রেটারি। সকাল ৭টার মধ্যেই তিনি অফিসে চলে আসতেন। আমি অফিসে আসতাম সাড়ে ৭টা থেকে ৮টার মধ্যে। একটানা কাজ। দুপুরে তিনি খাওয়া ও নামাজ পড়ার জন্য এক ঘণ্টার বিরতি নিতেন।

মাগরিবের নামাজের পর বিভিন্ন পেশা ও স্তরের লোকজনের সঙ্গে রাষ্ট্রপতি কথা বলতেন। রাজনীতির সঙ্গে আমার সম্পৃক্ততা ছিল না। ফলে ওই সব বৈঠকে আমি থাকতাম না। তবে সমাজের বিশিষ্টজনদের সঙ্গে মতবিনিময়ে দেশের কল্যাণের বিষয়টিই সেখানে প্রাধান্য পেয়েছে।

২টায় বাসায় ফিরলেও খুব ভোরেই তিনি ঘুম থেকে উঠে যেতেন। ফজরের নামাজ পড়ে নাশতা সেরে অফিসের জন্য তৈরি হতেন। চার ঘণ্টার বেশি ঘুমোতেন না। বঙ্গভবনে ব্যক্তিগত স্টাফ কিংবা কর্মকর্তাদের সঙ্গে তাঁকে কখনো কোনো খারাপ ব্যবহার করতে দেখিনি। গাফিলতি দেখলে কিছুটা উত্তেজিত হতেন। কাজে অবহেলার জন্য কেন এটা হয়নি, করেননি কেন—এতটুকুই বলতেন।

সংবাদপত্রে জিয়াউর রহমানের মৃত্যুর খবর

আসলে কাজপাগল এই মানুষটা বছরের ৩৬৫ দিনই কাজ করতেন। সেই সঙ্গে আমাদেরও ৩৬৫ দিন খাটাতেন। অবশ্য আমাদের তাতে দ্বিধা ছিল না। ঈদের দিনেও কাজ করেছি। সচিবেরা ছুটি কাটাতেন, কিন্তু বঙ্গভবনের স্টাফদের ছুটি ছিল না।

দাউদ খান মজলিসের প্রসঙ্গ উল্লেখ করে কাফি খান বলেন, আগেই আমি বলেছি, রাজনীতির সঙ্গে আমি সম্পৃক্ত ছিলাম না। এ জন্য রাষ্ট্রপতি একদিন আমাকে বললেন, আরও বৃহত্তর পরিসরে প্রেসের কাজটা করার জন্য দাউদ খান মজলিসকে আমাদের টিমে নিতে চান। দাউদ আমার বন্ধু। ওর সঙ্গে আমার ভালো যোগাযোগ আছে। ও তখন ফার ইস্টার্ন ইকোনমিক রিভিউর সাংবাদিক। রাষ্ট্রপতি অনুরোধ করেন, আমি যেন ওকে আনার ব্যবস্থা করি। ১৯৭৮ সালের শেষের দিকে উপমন্ত্রীর মর্যাদায় দাউদকে প্রেস অ্যাডভাইজার করে আনা হলো।

১৯৮১ সালের ৩০ মে চট্টগ্রামের সার্কিট হাউসে রাষ্ট্রপতি জিয়া শাহাদাতবরণ করলেন। ওই সফরে আমরা মিডিয়া টিমের কেউ ছিলাম না। চট্টগ্রাম যাওয়ার আগে তিনি বললেন, প্রেসের কেউই যাওয়ার প্রয়োজন নেই। কারণ, এটা রাষ্ট্রীয় নয়, রাজনৈতিক সফর।

ওই দিন ভোরে আমি শাহবাগে রেডিও অফিসে খবর পড়তে যাই। নিউজ এডিটর স্ক্রিপ্ট এনে দিলেন। সেখানে একটি খবর ছিল, রাষ্ট্রপতি জিয়া চট্টগ্রামে নানা কর্মসূচিতে অংশ নিয়েছেন, আজ তাঁর ঢাকায় ফেরার কথা রয়েছে। আমি নিউজ এডিটরকে বললাম, এটা কি কোনো খবর হলো? উনি বললেন, না স্যার, রাষ্ট্রপতির একটা খবর তো রাখতে হয়। আমি বললাম, তাই বলে কি এটা খবর? এর কি নিউজ ভ্যালু আছে? আমি এটি ফেলে দিলাম। স্বয়ং রাষ্ট্রপতির প্রেস সচিব নিউজটি বাদ দিলেন। বেচারা আর কী করবে।

যা–ই হোক, সকালের রেডিও বুলেটিনে খবর পাঠ করে বঙ্গভবনে এসে দেখি থমথমে ভাব। মিলিটারি সেক্রেটারির কক্ষে গিয়ে শুনলাম দুঃখজনক খবরটি—জিয়া নেই। আমার চোখ বেয়ে পানি বের হয়ে এল। কান্না থামাতে পারলাম না।

এরপর কিছুদিন ছিলাম বঙ্গভবনে। নভেম্বরে প্রেস সচিবের দায়িত্ব ছেড়ে দিই। রাষ্ট্রপতি সাত্তার আমাকে বঙ্গভবনে বিদায় সংবর্ধনা জানালেন। ভাগ্য ভালো ছিল, চলে গিয়েছিলাম। এর কিছুদিন পরই এরশাদ ক্ষমতা দখল করল। এরশাদ আসার আগে দাউদও এশিয়া ফাউন্ডেশনের একটি ফেলোশিপ নিয়ে আমেরিকা চলে যান। আমি আবার ভয়েস অব আমেরিকায় যোগদান করি। দাউদও সেখানে স্টোরি রাইটার হিসেবে যোগ দিলেন।

  • সৈয়দ আবদাল আহমদ সিনিয়র সাংবাদিক, বর্তমানে সরকারের প্রধান তথ্য কর্মকর্তা

Read full story at source